মনোহর পার্রিকার — যিনি বদলে দিয়েছিলেন গোয়ার রাজনীতিকে

মনোহর পার্রিকার — যিনি বদলে দিয়েছিলেন গোয়ার রাজনীতিকে

১৬-ই ডিসেম্বর, ২০১৮। টেলিভিশনের পর্দায় একটি ছবি দেখে গোটা ভারতের মানুষ চমকে উঠেছিল। একজন অত্যন্ত অসুস্থ মানুষ, শীর্ণকায়, নাকে রাইলস টিউব লাগানো — তাঁর গাড়ী থেকে ধীরে ধীরে নেমে মান্ডভী নদীর উপর নির্মীয়মান তৃতীয় সেতুর উপর উঠে নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন, গোয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন -এর কর্তাব্যক্তিদের কাছে কাজের অগ্রগতির হিসেব নিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন। এই সেতুটি ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রোজেক্ট। এই সেতু পানাজীর সাথে গোয়ার বাকি অংশের যোগাযোগকে অনেক সহজ করবে।

পর্যবেক্ষণ শেষ করে তাঁর গাড়ী ছুটলো গোয়ার জুয়ারী নদীর কাছে। সেই নদীর উপর তৈরি হচ্ছিল আর একটি সেতু। একটি অসাধারণ সুন্দর কেবল স্টেইড সেতু, যা উত্তর এবং দক্ষিন গোয়ার মধ্যে যোগাযোগকে আরো সুগম করবে। তর্কপ্রিয় ভারতীয়দের মধ্যে এ নিয়েও তর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ এও বলেছিলেন একজন অসুস্থ মানুষকে সামনে এনে তাঁর দল অত্যন্ত নীচু স্তরের রাজনীতি করছে। উত্তরটা দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। বলেছিলেন ‘ যতক্ষণ আমার শ্বাস চলবে ততক্ষণ আমি আমার রাজ্য গোয়ার জন্য কাজ করে যাবো । ‘ যাঁরা তাকে চিনতো তারা জানতো এটা কোন অতিরঞ্জিত আত্মপ্রশস্তি নয়। কারণ তাঁর নাম মনোহর পার্রিকার ( আমরা অনেকেই ভুল করে পারিক্কার লিখি)। দেশের আর পাঁচটা লোকের মতো ঢিলেঢালা স্বভাবের নয়। দৈনিক ১৮ ঘন্টা কাজ করা একজন ‘ওয়ারকোহলিক’। ক্যান্সারের সংগে লড়াই করে গত ১৭-ই মার্চ ২০১৯ তারিখেশেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করার আগে পর্যন্ত তিনি গোয়ার জন্যই কাজ করে গেছেন। অশিক্ষিত, নির্বোধদের সমালোচনার বিরুদ্ধে বোধহয় এটাই ছিল তাঁর মোক্ষম জবাব। হয়তো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল আরো অনেককে।

দীর্ঘদিন প্যাংক্রিয়াসে ক্যান্সারের চিকিৎসার কারণে নিয়মিত অফিসে যেতে পারেন নি বলে বিরোধী দলগুলো সমালোচনাও কম করে নি। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টির বহিস্কৃত নেতা ট্রাজানো ডি মেল্লো ( ইনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসে যোগ দেন) মুম্বাই হাইকোর্ট -এর পানাজী বেঞ্চে একটি আবেদনে বলেছিলেন যে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হোক কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। এছাড়া বিরোধী দলগুলো দ্বারা সরকার গড়ার নিরন্তর চেষ্টা তো ছিলোই। এমনকি পাররিকার যখন শয্যাশায়ী, তখন কংগ্রেসের এক শীর্ষ নেতা তাঁর সংগে দেখা করে বাইরে এসে তাঁদের কথোপকথন সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। পরে এর জন্য ক্ষমাও চাননি। এই কুৎসিত নীতিকে আর যাই হোক রাজনীতি বলে না। আর এ কারণেই বোধ হয় কেউ কেউ রাজনীতিকে স্কাউন্ড্রেলদের শেষ আশ্রয়স্থল বলেন।
সংবাদমাধ্যমের দৌলতে পার্রিকার -এর জীবনকাহিনী বহু মানুষের জানা। জন্মেছিলেন যখন (১৯৫৫) তখনও গোয়া পর্তুগালের অধীনে। জন্ম গোয়ার মাপসা শহরের কাছে। এলাকার নাম পারেআ । সেখান থেকেই পার্রিকার পদবি। জন্ম গৌড় স্বারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারে । বম্বে আই আই টি থেকে মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং- এ গ্র্যাজুয়েট । পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পড়া শুরু করলেও শেষ করেন নি আর এস এস -এর হয়ে কাজ করবেন বলে। আই আই টি -র গ্র্যাজুয়েটরা অত্যন্ত লোভনীয় চাকরি পায়। তাও হেলায় ছেড়ে দিয়েছেন। লক্ষ্য ছিল গোয়ার রাজনীতির অভিমুখটাকেই বদলে দেওয়া। পার্রিকার তা পেরেছিলেন। ১৯৮৯ সালের লোকসভা এবং বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ১ শতাংশেরও কম। ১১ বছরের মধ্যে বিজেপি গোয়ায় ক্ষমতায় এসেছিল। আর ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি গোয়ার দুটি লোকসভা কেন্দ্রে ভোট পেয়েছিল গড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ। এর একটা বড় কৃতিত্বই মনোহর পার্রিকারের।
রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পার্রিকারের কৃতিত্ব তাঁর রাজ্য গোয়ার রাজনীতির অভিমুখ আর চরিত্রটিকে বদলে দেওয়া। আর এস এস -এর জন্য নিবেদিতপ্রাণ পার্রিকার রাজনীতিতে এসেছিলেন আর এস এস – এর নির্দেশ অনুযায়ী। ১৯৮৮ সালে তিনি যখন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসেন তখন গোয়ায় বিজেপির সক্রিয় কর্মী সংখ্যা মাত্র ৪০০০ । বর্তমানে গোয়াতে বিজেপির সক্রিয় কর্মী সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লক্ষ, গোয়ার মোট ১৫ লক্ষ জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর গোয়া কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পার্রিকার। ভোট পান ২৫০০০ – এর মতো। এর তিন বছর পরেই মাপসার এই অধিবাসী রাজধানী পানাজীর ‘দখল নেন।’ ১৯৯৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস দুর্গ পানাজী থেকে তিনি জিতে যান। ১৯৯৪ সালের পর থেকেই পানাজী হয়ে ওঠে বিজেপির দুর্ভেদ্য দুর্গ, সৌজন্যে মনোহর পার্রিকার। ১৯৯৪ সালেই প্রথম বিজেপি চারজন সদস্য নিয়ে গোয়া বিধানসভায় প্রবেশ করে। আর দুর্নীতি বিরোধী যোদ্ধা হিসেবে গোয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ শুরু করেন মনোহর পার্রিকার।
বিগত শতাব্দীর ৮০ – এর দশকের শেষ পর্যন্ত গোয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো প্রধানত দুটি দল : মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি বা এম জি পি এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। গোয়ার প্রথম দুই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এম জি পি -এর প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ বান্দোডকার এবং তাঁর কন্যা শশীকলা কাকোডকার। ৭০ – এর দশক থেকেই গোয়াতে কংগ্রেসের প্রভাব বাড়তে থাকে। প্রায় ২৭ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান অধ্যুষিত গোয়াতে বিজেপিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। পার্রিকার ঠিক সেটাই করতে পেরেছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর হাতিয়ার ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বহুদিনই গোয়ার রাজনীতিকে গ্রাস করে রেখেছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামীর ইমেজই পাররিকারকে গোয়ার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে দেশের প্রথম আই আই টি প্রাক্তনী হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন পার্রিকার। এই সরকার ফেব্রুয়ারি ২০০২ পর্যন্ত টিকেছিল।২০০২ সালের জুন মাসে তিনি পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে ৪ জন বিজেপি বিধায়ক পদত্যাগ করার ফলে সরকারের পতন ঘটে। ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ও তার সহযোগী দলগুলি মোট ৪০ টির মধ্যে ২৪ টি আসন লাভ করে। পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন পার্রিকার। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুরোধে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন পার্রিকার, যদিও প্রথমের দিকে গোয়া ছেড়ে আসতে তিনি একেবারেই রাজি ছিলেন না। তবে পার্রিকার গোয়া থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে দিল্লি চলে আসার ফলে গোয়ার রাজনীতিতে যে ব্যাপক শূন্যতা দেখা দিয়েছিল তা পূরণ করা নতুন মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত পার্সেকারের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এর প্রভাব পড়েছিল ২০১৭ সালের নির্বাচনে যখন বিজেপি তুলনামূলকভাবে খারাপ ফল করে, এমন কি একক বৃহত্তম দল হতেও ব্যর্থ হয় বিজেপি। সরকার গঠন করতে হয় ছোট দলগুলিকে সংগে নিয়ে। ছোট দলগুলির শর্তই ছিল যদি পার্রিকার মুখ্যমন্ত্রী হন তবেই তারা সরকার গঠনে সহযোগিতা করবে। ফলে পার্রিকারকে আবার ফিরতে হয় গোয়ায়, নেতৃত্ব দিতে হয় কোয়ালিশন সরকারের। পার্রিকারের ব্যক্তিত্ব এবং গ্রহনযোগ্যতা কতখানি ছিল তার প্রমাণ মিলেছে পার্রিকারের মৃত্যুর পর সরকার গঠন করতে গিয়ে। তিন সদস্য বিশিষ্ট মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টিই মুখ্যমন্ত্রীত্বের দাবি করে বসেছিল।আপাতত দুটি ছোট দলকে (মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি এবং গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি) উপমুখ্যমন্ত্রীত্ব দিয়ে সমস্যা কাটালেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নতুন মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওন্ত কতখানি পালন করতে পারেন সেটাই এখন দেখার।
আসলে মনোহর পার্রিকারের প্রধান গুণ ছিল তাঁর ফায়ারব্রান্ড পারসোনালিটি, অথচ সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা। খ্রিস্টানদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। প্রায়ই যেতেন চার্চে। চার্চের ফাদারদের সাথে ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক । অবাধে মিশতেন সব ধর্মের মানুষদের সাথে। বর্তমানে গোয়া বিধানসভায় বিজেপির নির্বাচিত সদস্যদের অর্ধেকই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় পার্রিকার ছিলেন একজন মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট , যিনি বিপক্ষের কৌশল ধরে নিতে পারতেন, আর সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করতে পারতেন । আবার তাঁর সারল্য এবং অতি সাধারণ জীবন দিয়ে তিনি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন একান্তভাবেই তাদের নিকটজন। তাঁর ট্রেডমার্ক পোশাক ছিল হাফহাতা বুশ শার্ট, ট্রাউজার এবং চপ্পল।এই পরে সামরিক বাহিনীর গার্ড অব অনারও তিনি নিয়েছিলেন। নিজের ব্যাগ নিজেই বহন করতেন, গাড়ির বদলে কারো মোটরবাইকের পিছনে বসে সমান স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে যাতায়াত করতে পারতেন। এই গুণাবলীর কোনটাই বহু চেষ্টায় তৈরি করা নয়, এটাই ছিল তাঁর স্বাভাবিক গুণ। এই মুখ্যমন্ত্রী জনগণের মুখ্যমন্ত্রী হবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এ কারণেই গোয়ার মতো একটি রাজ্যে সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে সম্ভব করা তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। ধর্ম ও জাতপাতের বেড়া ভেঙে সবার কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হতে পেরেছিলেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই হয়েছে রাফাল চুক্তি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর বক্তব্য ছিল পরমাণু অস্ত্র প্রথম ব্যবহার না করার বিষয়ে ভারতের নীতি ( No First Use Policy ) পর্যালোচনা করা উচিৎ। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে ভারতের সেনাবাহিনী যে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে তার তত্ত্বাবধান করেছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পার্রিকার।
মনোহর পার্রিকার ছিলেন এক বিরল রাজনীতিবিদ যিনি অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত অথচ সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত। দেশের হয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা তাঁর ছিল। তাঁর নিজের গুনেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনগণের নেতা। ক্ষমতাই তাঁর কাছে এসেছে। তিনি ক্ষমতার পিছনে ছোটেন নি। ক্ষমতার জন্য তাঁকে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতির অবলম্বন করতে হয় নি। তাই রাজনীতিতে একজন সত্যিকারের রোল মডেলের নাম মনোহর পার্রিকার।।

6 Comments on “মনোহর পার্রিকার — যিনি বদলে দিয়েছিলেন গোয়ার রাজনীতিকে

minecraft

For hottest news you have to pay a quick visit world
wide web and on internet I found this site as a most excellent website for most
recent updates.

levitra kopen zonder recept

Hi there colleagues, good piece of writing and pleasant arguments commented here, I am genuinely enjoying by these.

minecraft

Great post! We are linking to this particularly great post on our website.
Keep up the good writing.

minecraft

Nice post. I used to be checking constantly this blog
and I’m inspired! Extremely helpful information specifically the last part 🙂 I handle such information much.

I was looking for this particular information for a long time.
Thank you and good luck.

Generic cialis

I love your blog.. very nice colors & theme. Did you design this website yourself or did
you hire someone to do it for you? Plz answer back as I’m looking to create my own blog and would like to find out where u got this from.
appreciate it

Comments are closed.

Categories

Upcoming Events

View All Events