শতবর্ষের আলোকে সিদ্ধার্থ শংকর রায় – Bimal Sankar Nanda





শতবর্ষের আলোকে সিদ্ধার্থ শংকর রায় : ব্যক্তি ও রাজনীতি
————————-
বিমল শংকর নন্দ
 
প্রায় নিঃশব্দে চলে গেল সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের জন্ম শতবর্ষ ( সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের জন্ম ২০ অক্টোবর ১৯২০)। সামান্য একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল তাঁর দল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি । দলের ‘চিরন্তন’ এবং ‘অপরিবর্তনীয়’ নেতৃত্ব তথা গান্ধী পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে নিয়ে একটা টুইটও চোখে পড়ে নি। অন্তত সংবাদ মাধ্যমে আসে নি। অথচ এক সময় এই সিদ্ধার্থ শংকর রায়ই রাজনৈতিক ভাবে ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ছিলেন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপদেষ্টা। কিন্তু গান্ধী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে মনে রাখে নি। সিদ্ধার্থ শংকর পাঁচ বছর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকেও কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর বেরোয় নি। চোখে পড়ে নি সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে স্মরণ করে সরকারের কোন কর্তাব্যক্তির করা কোন টুইট। ২০১৯ সালের ২০ শে অক্টোবর দু একটি অনুষ্ঠানের খবর সংবাদমাধ্যমে এলেও সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের জন্মশতবর্ষ শেষ হল অধিকাংশ মানুষের চোখের আড়ালে। তবে শুধু এবারেই নয়। ২০১০ সালের ৬-ই নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর শেষকৃত্য সারা হয়েছিল একেবারে সাদামাটাভাবেই। রাষ্ট্রীয় শোক তো দূরের কথা, রাজ্যস্তরেও তাঁর স্মরণে তেমন কিছু করেনি তৎকালীন বাম সরকার। অথচ বামফ্রন্ট যে দুজন মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবাংলাকে উপহার দিয়েছে সেই জ্যোতি বসু কিংবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের চেয়ে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের অবদান কোন অংশে কম নয়, বরং কিছুটা হয়তো বেশীই। কারণ সিদ্ধার্থ শংকর ২৩ বছর কিংবা ১১ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মাত্র পাঁচ বছর। আর এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে তিনি সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রফুল্ল ঘোষ কিংবা বিধান চন্দ্র রায় ছাড়া আর কাউকে এই রকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে হয় নি।
 
তাই এতোটা অবহেলা কিন্তু সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের প্রাপ্য ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক মত বা ক্রিয়াকলাপ কারোর পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু তাঁর রাজনীতি, নেতৃত্ব এবং বাংলার রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার নিরপেক্ষ এবং নির্মোহ বিশ্লেষণ অবশ্যই প্রয়োজন।
 
এক জটিল সময়ে সিদ্ধার্থ শংকর এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর মাত্র পাঁচ বছরের মুখ্যমন্ত্রীত্বে এ রাজ্যের কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে উন্নতিও ঘটেছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। প্রায় ভেঙেচুরে যাওয়া একটা সমাজকে দাঁড় করানোর নিরন্তর চেষ্টা তিনি করে গিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ শংকর রায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ভয়ংকর ও হিংস্র নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা ভারত – পাক যুদ্ধ ও তার পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ংকর উদবাস্তু সমস্যার। দুটোকেই তিনি সামলেছিলেন বেশ দক্ষতার সঙ্গে। এক সফল রাজনীতিবিদ কিংবা জননেতা তাঁকে হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রীও বলা যাবে না সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে।
 
২০১০ সালের ৬-ই নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে Obituary লিখতে গিয়ে Frontline পত্রিকায় তাঁকে বলা হয়েছিল একজন Political Aristocrat অর্থাৎ অভিজাত রাজনীতিক। এটা ঠিক যে কলকাতার এক অভিজাত পরিবারেরই সন্তান ছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। বাবা সুধীর কুমার রায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা ব্যারিস্টার এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য। মা অপর্ণা দেবী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং বাসন্তী দেবীর বড় মেয়ে। অর্থাৎ সিদ্ধার্থ শংকর ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বোন মঞ্জুলা বসু কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মহিলা বিচারপতি হয়েছিলেন ( তিনি এবং পদ্মা খাস্তগীর একদিনে বিচারপতি নিযুক্ত হন)। সুপ্রিম কোর্টের পূর্বতন প্রধান বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাশ এবং বাংলার প্রাক্তন এডভোকেট জেনারেল সতীশ রঞ্জন দাশ ছিলেন এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এই আভিজাত্যই সারা জীবন বহন করেছেন সিদ্ধার্থ শংকর। সাধারণভাবে কখনো তাঁকে কারোর সম্পর্কে কুৎসিত কিংবা অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করতে শোনা যায় নি। তাঁর সম্পর্কে অনেকেই অতি কুৎসিত মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তিনি পাল্টা খারাপ মন্তব্য করেন নি। সত্যিই তাঁর শিক্ষা, রুচি এবং অননুকরণীয় আভিজাত্য ছিল। হয়তো এই আভিজাত্য ভেদ করে সাধারণ মানুষের একজন হতে পারেন নি তিনি। ফলে সফল রাজনীতিবিদও হতে পারেন নি সিদ্ধার্থ শংকর রায়। আভিজাত্যের বর্ম ভেদ করে সাধারণ মানুষের নেতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বোস কিংবা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। সিদ্ধার্থ শংকর রায় ওই পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রথমে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে, বাংলায় গোটা ভারতের মধ্যে প্রথম পশ্চিমী শিক্ষা চালু হওয়ার কারণে এ অঞ্চলেই প্রথম এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। ক্রমে এই শ্রেণী ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী বলে পরিচিতি লাভ করে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মতো রাজনীতির ক্ষেত্রটিও ছিল এদের নিয়ন্ত্রণে। স্বাধীনতা আন্দোলনে যেমন এদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, স্বাধীনতার পরেও প্রায় ছয় দশক বাংলার রাজনীতিতে ছিল এই ভদ্রলোক শ্রেণীর প্রাধান্য। বাংলার রাজনীতিতে ভদ্রলোক শ্রেণীর এই উত্থান ও প্রাধান্যের অসাধারণ আলোচনা করেছেন J. H. Broomfield তাঁর Elite Conflict in a Plural Society গ্রন্থে। সিদ্ধার্থ শংকর রায় বাংলার রাজনীতিতে এই ‘ভদ্রলোক ঐতিহ্য’ বহনকারী রাজনীতিবিদ।
 
দেশবন্ধুর নাতি হলেও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেন নি সিদ্ধার্থ শংকর। বরং পড়াশোনা এবং খেলাধুলাতে বেশী মনোনিবেশ করেছিলেন। ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজের কৃতি ছাত্র। কলেজে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতি করলেও ব্রিটিশ – বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন নি। বরং পড়াশোনার পাশাপাশি কলেজের হয়ে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলায় যথেষ্ট নাম করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্রিকেট দল আন্তঃকলেজ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা জিতেছিল। আন্তঃকলেজ ক্রিকেটে পরপর তিন বছর ডবল সেঞ্চুরি এবং ১০০০ রান করার কৃতিত্বও অর্জন করেছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের ফুটবল টিমের ক্যাপটেন হিসেবে জিতেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ইলিয়ট ও হার্ডিঞ্জ শিল্ড। এমন কি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলেছিলেন। অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি ব্লু হওয়ার কৃতিত্বও তিনি অর্জন করেছিলেন। লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময়েও ইন্ডিয়ান জিমখানা ক্লাবের হয়ে তিনি ক্রিকেট খেলেছিলেন। আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ না হয়ে খেলা চালিয়ে গেলেও দেশের নামকরা ক্রীড়াবিদ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ তখন ভারতের ক্রীড়া জগতে বিশেষত ক্রিকেটে রাজা-রাজড়া ও দেশের অভিজাত শ্রেণীর জন্য সুযোগ অনেক বেশী থাকতো।
 
কিন্তু রাজনীতি যার রক্তে তার পক্ষে রাজনীতির টান এড়ানো কঠিন। ১৯৪৬ সালে ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে কলকাতা হাইকোর্টে প্রাকটিস শুরু করেন স্যার আশুতোষ মুখার্জির পুত্র রমাপ্রসাদ মুখার্জির জুনিয়ার হিসেবে। ১৯৫৪ সালে হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের জুনিয়র কাউন্সেল। এরপর সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৫৭ সালে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জিতে তিনি পশ্চিম বাংলা বিধানসভার সদস্য হন। ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মন্ত্রীসভায় সবচেয়ে কমবয়সী মন্ত্রী হন, উপজাতি উন্নয়ন ও আইন বিভাগের দায়িত্ব পান। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে বিশেষত বিধান চন্দ্র রায়ের সাথে মতবিরোধের কারণে ১৯৬২ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়ান নি। বাম দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেই জেতেন ১৯৬২ সালের নির্বাচনে। সেই সময় তিনি ছিলেন রাজ্যের কংগ্রেস দল ও তার সরকারের তিক্ত সমালোচক। অবশ্য ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি আবার কংগ্রেসে ফিরে আসেন। রাজনৈতিকভাবে ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সিদ্ধার্থ শংকর। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের সাথে সিদ্ধার্থ শংকরের বনিবনা না থাকার কারণে ইন্দিরার আগ্রহে তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি রায়গঞ্জ কেন্দ্র থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন এবং ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় শিক্ষামন্ত্রী হন। পরে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ক দপ্তরেরও দায়িত্ব দেন। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ আস্থাভাজন। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসে ভাঙন ধরে এবং তৎকালীন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতৃত্বের অধিকাংশই ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ছেড়ে সংগঠন কংগ্রেস তৈরি করেন। এই পরিস্থিতিতে ইন্দিরা চাইছিলেন দলের সংগঠনে এবং সরকারের বিভিন্ন পদে তাঁর আস্থাভাজন ব্যক্তিরাই আসীন হোন। একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী হওয়ার কারণে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের উপর ইন্দিরার ভরসা ছিল অনেক বেশী, কারণ প্রয়োজনীয় আইনগত পরামর্শগুলিও তিনি সিদ্ধার্থ শংকরের কাছ থেকেই পেতেন। ইন্দিরা গান্ধী তখন প্রায় প্রতিদিন এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন যেগুলির আইনগত তাৎপর্য ও রাজনৈতিক ফলাফল ছিল সুদুরপ্রসারি। এই সময় সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের মতো আইনজীবীর প্রয়োজন ছিল ইন্দিরার। এভাবেই ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে পড়েছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। সিদ্ধার্থ শংকর রায় ইন্দিরা গান্ধীর কতটা আস্থাভাজন ছিলেন তা একটি ঘটনা বললে বোঝা যাবে। ১৯৭৫ সালের ১২-ই জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি জগমোহন লাল সিনহা ১৯৭১ সালে উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলি লোকসভা কেন্দ্র থেকে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল করে দেন। কারণ বিচারপতি সিনহা মনে করেছিলেন যে এই নির্বাচনে জিততে ইন্দিরা অনেক অন্যায় পন্থা অবলম্বন করেন। ১৯৭৪ সাল থেকেই জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে গোটা ভারত উত্তাল হয়ে উঠেছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় সেই আগুনে ঘি ঢেলেছিল। কংগ্রেস বিরোধী সব দলই হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী পদত্যাগে রাজি ছিলেন না। কারণ তাঁর ভয় ছিল একবার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে ক্ষমতার বৃত্তে ফিরে আসা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। নিজের মন্ত্রীসভার সদস্যদের উপরও তাঁর আস্থা ছিল না। এ প্রসঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রীসভায় প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্দার স্বর্ণ সিং পরবর্তীকালে মন্তব্য করেছিলেন যে ওই সময় সিদ্ধার্থ শংকর রায় যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় থাকতেন ইন্দিরা হয়তো তাঁর হাতেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে রাজি হতেন। তাহলে হয়তো ২৪-শে জুন ১৯৭৫ সালে জরুরী অবস্থা জারী করার প্রয়োজন হতো না। ভারতের রাজনীতিও অন্য খাতে বইতো।
 
সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের উপর তাঁর গভীর আস্থার কারণেই ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ১৯৭২ সালে পশ্চিম বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে রাজ্যের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেন। তার আগের পাঁচ বছর ছিল বাংলার রাজনীতির এক অরাজক অধ্যায়। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এ রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জনে ব্যর্থ হয়। তৈরি হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার যার মূল চালিকাশক্তি ছিল সি পি আই(এম)। কিন্তু এই সরকার মাত্র নয় মাসের মতো টিকে ছিল। বাংলার কংগ্রেস নেতাদের আশা ছিল পরের নির্বাচনে দল ক্ষমতায় ফিরতে পারবে। কিন্তু ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস অত্যন্ত খারাপ ফল করে। ১৯৬৭ সালের পশ্চিম বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে মোট ২৮০ টি ( তখন আসন ছিল ২৮০) আসনের মধ্যে কংগ্রেস ১২৭ টি আসন এবং ৪১.১৩ % ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৯ সালে বিধানসভার মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এই নির্বাচনে মাত্র ৫৫ টি আসন পায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। এই নির্বাচনের কিছুদিন পরেই রাজ্য কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা অতুল্য ঘোষ প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। ইতিমধ্যে ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসে ভাঙন ধরলে তার প্রভাব পড়ে বাংলার রাজনীতিতে। ১৯৭০ সালে বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসও ভাঙনের মুখে পড়ে। বর্ষীয়ান নেতৃত্বের অধিকাংশই সংগঠন কংগ্রেসে চলে যান। ইতিমধ্যে ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া নকশাল আন্দোলন শুধু বাংলার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করে নি, গোটা সমাজকেই প্রায় তছনছ করে দিয়েছিল। সব থেকে বিপর্যস্ত হয়েছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। নকশাল নেতা চারু মজুমদারের ব্যক্তিহত্যার নীতি গোটা বাংলায় তৈরি করেছিল ভয়ঙ্কর এক নিরাপত্তাহীনতা। একের পর এক জোট সরকারের পতনের ফলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা কঠোরভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিল না। পশ্চিম বাংলার মতো একটি সীমান্তবর্তী রাজ্যে এই অবস্থা চলতে দিতে কেন্দ্র রাজি ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর মনে হয়েছিল অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং ক্লীন ইমেজের নেতা সিদ্ধার্থ শংকর রায় এই পরিস্থিতিতে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন। ইতিমধ্যে পশ্চিম বাংলায় কংগ্রেস ধীরে ধীরে তার শক্তি ফিরে পাচ্ছিল। ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত পশ্চিম বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ১০৫টি আসন পায়। অবশ্য এবারেও জোট সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। আবার রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করতে হয়। ইন্দিরা গান্ধীর আশা ছিল পরের বিধানসভা নির্বাচনে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় আসতে পারবে আর কঠোরভাবে এক ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যবাদী নকশাল আন্দোলন দমন করে বাংলায় আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
 
সিদ্ধার্থ শংকর রায় ইন্দিরা গান্ধীকে হতাশ করেন নি। ১৯৭২ সালের ১১-ই মার্চ অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ২১৬ টি আসন পায় যা ১৯৭১ সালের নির্বাচনের চেয়ে ১১১ টা বেশী। এই নির্বাচনে কংগ্রেস ও সি পি আই মোর্চা করে একসাথে লড়াই করেছিল। গঠন করেছিল Progressive Democratic Alliance বা PDA । কংগ্রেসের জোটসঙ্গী সি পি আই পায় ৩৫ টি আসন। প্রধান প্রতিপক্ষ সি পি আই (এম) পায় মাত্র ১৪ টি আসন যা ১৯৭১ সালের নির্বাচনের চেয়ে ৯৯ টা কম। এই নির্বাচনে সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল হয়েছিল বরানগর কেন্দ্রে যেখানে সি পি আই(এম) নেতা জ্যোতি বসু কংগ্রেসের জোট শরিক সি পি আই প্রার্থী শিবপদ ভট্টাচার্যের কাছে প্রায় চল্লিশ হাজার ভোটে হেরে যান। নির্বাচনে ব্যাপক রিগিং-এর অভিযোগ তুলে সি পি আই(এম) এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে এবং পরের পাঁচ বছর বিধানসভা বয়কট করে। পরবর্তী কালে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বিরুদ্ধে সি পি আই(এম)-এর প্রচার এবং সমালোচনার মূল বিষয় ছিল ১৯৭২ সালের নির্বাচনে রিগিং। বামেরা খুব কৌশলে এই ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল। কিন্তু সত্যিই কি ১৯৭২ সালের নির্বাচনে বাংলার সর্বত্র ব্যাপক রিগিং হয়েছিল? এ নিয়ে পরবর্তীকালে গবেষণা করেছিলেন অধ্যাপক বঙ্গেন্দু গাঙ্গুলি ও অধ্যাপিকা মীরা গাঙ্গুলি। তাঁদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল Voting Behaviour in a Developing Society গ্রন্থে। তাঁদের মতে অল্প কিছু আসনে রিগিং হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপক রিগিং-এর অভিযোগ একেবারেই ঠিক নয়। ওটা ছিল ব্যাপক প্রচার করে তৈরি করা একটা ধারণা। এই দুই গবেষকই কিন্তু ছিলেন বামপন্থী, এক সময় তাঁরা সি পি আই দলের সদস্য ছিলেন। যাই হোক, তৎকালীন সময়ের ঘটনাক্রম ঠিকমতো বিশ্লেষণ করলে এটা বোঝা কঠিন হবে না যে ১৯৭২ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসই জিততো কারণ দীর্ঘ পাঁচ বছরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নৈরাজ্যের কারণে মানুষ বিরক্ত ছিল। সর্বোপরি নকশাল নামক উগ্র বামদের ধ্বংস ও হত্যার রাজনীতি বামপন্থীদের সম্পর্কে মানুষের মন বিষিয়ে দিয়েছিল। আর এটা সকলেই জানে যে নকশালরা ছিল সি পি আই(এম)-এরই একটা দলছুট গোষ্ঠী। অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধীর গরিবী হঠাও কর্মসূচি গোটা দেশের মতো বাংলাতেও জনপ্রিয় হয়েছিল। আর ১৯৭১ সালে ভারত – পাক যুদ্ধ জিতে এবং ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানকে দু টুকরো করে দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী তথা কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা তখন গগনচুম্বী। গোটা দেশের মতো পশ্চিম বাংলাতেও ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে মানুষ প্রগতিশীলতা ও পরিবর্তনের প্রতিভু বলে ধরে নিয়েছিল।
 
ইন্দিরা গান্ধীর দ্বিতীয় আশাটিও পূরণ করেছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর। কড়া হাতে নকশাল আন্দোলন দমন করেন তিনি। এ ব্যাপারে তিনি পুলিশকে পুরো স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কঠোর পুলিশী পদক্ষেপে নকশাল আন্দোলনের কোমর ভেঙে যায়। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ – এর দুই যুক্তফ্রন্ট সরকার বাংলার শিল্পোৎপাদনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। এমনিতে এ রাজ্যের আগ্রাসী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে শিল্প মালিকেরা ভীষণ ভয়ে ছিল। তার উপর প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে কোন গনতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না। সেই সরকারের শ্রমমন্ত্রী এস এউ সি আই নেতা সুবোধ ব্যানার্জি কঠোরভাবে এই নীতির রূপায়ণ ঘটাচ্ছিলেন। একের পর এক কলকারখানায় গনতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মালিক ও ম্যানেজারদের ঘেরাও, শারীরিক নিগ্রহ শুরু হয়ে যায়। পুলিশের কোন সাহায্য পাওয়া যাচ্ছিল না। শিল্পমালিকদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। একের পর এক শিল্প বাংলা ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের প্রধান লক্ষ্য ছিল শিল্পমালিকদের আস্থা অর্জন। সে কাজে পুরোটা না হলেও অনেকটা সফল হয়েছিলেন তিনি। শিল্পক্ষেত্রে অনেকটাই সুস্থিতি ফিরেছিল। কৃষি উৎপাদনে বিশেষত ধান উৎপাদনে এ রাজ্য যথেষ্ট উন্নতি করতে পেরেছিল। ১৯৬৪-৬৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর উদ্যোগে ভারতে ব্যাপক ভিত্তিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফল হিসেবে ৬০-এর দশকের শেষ দিকে হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশে সবুজ বিপ্লব ঘটে যায়। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সরকার পশ্চিম বাংলায় উচ্চ ফলনশীল ধান চাষে উৎসাহ দিতে থাকে এবং এর ফলে তাঁর আমলে এ রাজ্যে ধানের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে এ রাজ্যে ধানের উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১১ লক্ষ মেট্রিক টন, ১৯৭২ সালের ধান উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ। পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করতে পেরেছিল সরকার। একটা প্রায় ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় এটা খুব কম কৃতিত্বের বিষয় নয়।
 
বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ৭২-৭৭ কথাটা নিন্দাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ এই পাঁচ বছর বাংলার শাসন নাকি ছিল একেবারে ভয়ঙ্কর। বামেরা একে সন্ত্রাসের শাসন, আধা-ফ্যাসিবাদী শাসন প্রভৃতি চোখা চোখা শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিয়ে বামেরা তাদের স্বার্থেই এই ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করলেও কোন এক অজানা কারণে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের দল কংগ্রেস কখনো সেভাবে এর উত্তর দেয় না। কিন্তু উত্তর দেওয়ার অনেক কিছুই আছে। ১৯৭২-৭৭ এর আগে এ রাজ্যে ১৯৬৭-৭১ও ছিল। ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস, ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি বাংলার সমাজটাকেই নড়বড়ে করে দিয়েছিল। সেখান থেকে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছিল অতি দূরুহ কাজ। একদল আগাপাশতলা নৈরাজ্যবাদী, বুদ্ধিমান কিন্তু খুনে মানসিকতার তথাকথিত বিপ্লবী মানুষ সামাজিক বিশৃঙ্খলাকেই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করে ফেলার চেষ্টা করছিল। অদ্ভুতভাবে এই মানসিকতার লোকেদের প্রতি কিছু মানুষের সমর্থন তখনো ছিল, সামান্য হলেও এখনো আছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই সফল হয়েছিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল্যায়ন করতে গেলে আরো কিছু বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে। দেশভাগ, উদবাস্তু স্রোত, সামাজিক বিশৃঙ্খলার মোকাবিলা তাঁকেও করতে হয়েছিল। কিন্তু বিধান চন্দ্র রায়কে কংগ্রেস সংগঠন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় নি। সে কাজটি করতেন অতুল্য ঘোষ। সাংগঠনিক সমস্ত সমস্যা অতুল্য ঘোষই মেটাতেন। বাইরের কোন সাহায্য তাঁর লাগে নি। আর অতুল্য ঘোষ কেবল বাংলায় নয়, সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সংগঠনে একটি পরিচিত নাম ছিলেন। দুই সি পি আই(এম) মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও এক আপাত শৃঙ্খলাবদ্ধ দলের সাহায্য পেয়েছিলেন। যে সময় সিদ্ধার্থ শংকর রায় পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন তার তিন বছর আগে কংগ্রেস ভেঙেছে। দলের সমস্ত ক্ষমতা ধীরে ধীরে ইন্দিরা গান্ধীর হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী কখনোই শৃঙ্খলাবদ্ধ দল তৈরির চেষ্টা করেন নি। দলে তাঁর প্রতি আনুগত্যই ছিল শেষ কথা। এখনো কংগ্রেস একই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহন করে চলে। গান্ধী পরিবারের প্রতি অনুগত থাকলে যত খুশী বিশৃঙ্খল আচরণ করলেও পার পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালেও কংগ্রেস খুব আলাদা কিছু ছিল না। তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের পাঁচ বছর ধরে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এর সাথে তাঁর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ বিতর্ক তৈরি করেছিল। সিদ্ধার্থ শংকর রায় ব্যক্তিগতভাবে অসম্ভব সৎ হলেও দুর্নীতি গোটা দলকে গ্রাস করেছিল। ১৯৭২ সালের ২০ মার্চ পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। কিন্তু এই পদের দিকে নজর ছিল গনি খান চৌধুরী, তরুণকান্তি ঘোষ প্রভৃতি নেতার। ইন্দিরা গান্ধীর পছন্দের উপর এঁরা কোন কথা না বললেও মন থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে মেনে নিতে পারেন নি। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরই সিদ্ধার্থ শংকর রায় মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে পশ্চিম বাংলার ২৮০ টি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ১০০ জন করে নিয়ে মোট ২৮০০০ জনকে রাজ্য সরকারের অধীনে ক্লাস থ্রি এবং ক্লাস ফোর পদে চাকরি দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর উপর দায়িত্ব দেওয়া হলো মন্ত্রীসভার কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে একটি সাব-কমিটি তৈরি করতে যারা ঠিক করবে কিভাবে পদগুলো পূরণ করা হবে। এম এল এ দের ক্ষমতা দেওয়া হলো তাঁদের নির্বাচনকেন্দ্র থেকে ৩০ জনের নাম সুপারিশ করার। ক্লাস থ্রি পদে নিয়োগ হতো পাবলিক সার্ভিস কমিশন দ্বারা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে। কিন্তু কমিশনকে এড়িয়ে মন্ত্রী এবং এম এল এ – দের হাতে নিয়োগের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ফল একেবারেই ভালো হয় নি। দুর্নীতির দরজা পুরোপুরি খুলে গিয়েছিল। সরকারি চাকরি করিয়ে দেওয়ার নাম করে টাকা তোলার অভিযোগ আসতে থাকে। দলের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে কংগ্রেস দল ও মন্ত্রীসভা জেরবার হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ২৫ জুলাই তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী কাশীকান্ত মৈত্রের কনফিডেনসিয়াল এসিস্ট্যান্ট প্রচুর পরিমাণ হিসাব বহির্ভূত নগদ টাকা বহন করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তদন্ত করতে গিয়ে ভুসি কেলেঙ্কারির ঘটনা জনসমক্ষে চলে আসে। সরকার পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। খাদ্যমন্ত্রী কাশীকান্ত মৈত্র পদত্যাগ করেন। বেশ কিছুদিন ধরে তদন্ত চলেছিল। এই কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দু একজন মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও ছিলেন। সিদ্ধার্থ শংকর রায় কখনো তাদের আড়াল করার চেষ্টা করেন নি। সরকার ও শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এখানেই শেষ হয় নি। ১৯৭৪ সালের ৭-ই জুন রাজ্য যুব কংগ্রেসের সভাপতি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য ছাত্র পরিষদের সভাপতি কুমুদ ভট্টাচার্য এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের পাঁচজন মন্ত্রী এবং তিনজন শীর্ষ সরকারি অফিসারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের পদত্যাগ দাবি করেন। এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তাঁরা দল থেকে পদত্যাগের হুমকি দেন। ছাত্র-যুবদের চটিয়ে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯৭২ সালের নির্বাচনে বিধানসভার প্রায় ৫০ শতাংশ আসনে ছাত্র – যুবদের প্রার্থী করা হয়েছিল। কংগ্রেসের ছাত্র ও যুব কর্মীরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়ভাবে নকশালদের প্রতিরোধ করছিল। এছাড়া দলের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কারণে সিদ্ধার্থ শংকরও অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন। তাই দুই ছাত্র ও যুব নেতা দুর্নীতির অভিযোগ তোলা মাত্রই তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সংগে কথা বলে বিচারপতি ওয়াঞ্চু-র নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। ওয়াঞ্চু কমিশন গঠন কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেয়। মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধী গোষ্ঠীর নেতারা বলতে শুরু করেন ওয়াঞ্চু কমিশনের দ্বারা মুখ্যমন্ত্রী দলে তাঁর বিরোধীদের জব্দ করতে চাইছেন। কংগ্রেস পরিস্কারভাবে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। গনি খান চৌধুরী, তরুণকান্তি ঘোষ, প্রফুল্লকান্তি ঘোষ প্রমুখ নেতারা মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে সরাতে উঠেপড়ে লাগেন। সরকারের বিরুদ্ধে একই দলের লোকেদের প্রকাশ্য মিটিং, সমালোচনা চলতেই থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ১৯৭৪ সালের ১৩-ই ডিসেম্বর গনি খান চৌধুরী, তরুনকান্তি ঘোষ প্রমুখ কংগ্রেস নেতা রাজ্যপাল এ. এল. ডায়াসের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানান যে প্রশাসন প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাঁরা অবিলম্বে রাজ্যপালের হস্তক্ষেপ চান। দলের পরিবর্তন বিরোধীরাও এবার আসরে নেমে পড়েন। তাঁরাও মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থনে মিটিং মিছিল শুরু করেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে গনি খান চৌধুরী, তরুনকান্তি ঘোষদের সাথে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বাক্যালাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেসের শীর্ষস্তরে এই ধরনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের প্রভাব দলের নীচের স্তরে এবং শাখা সংগঠনগুলোর উপর পড়তে থাকে। ছাত্র পরিষদ, যুব কংগ্রেসের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং তাদের মধ্যে মারামারি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
 
আর একটি ঘটনা বাংলায় কংগ্রেস দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং সেটা হল ১৯৭৫ সালে সঞ্জয় গান্ধীর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ। সঞ্জয় গান্ধী সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে শত্রু মনে করতেন কারণ সিদ্ধার্থ শংকর সঞ্জয় গান্ধীর মারুতি প্রজেক্ট -এর বেশ কিছু বেনিয়ম নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সরোজ চক্রবর্তী তাঁর With West Bengal Chief Ministers গ্রন্থে লিখেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় তাঁর কিছু ব্যক্তিগত ও গোপনীয় চিঠি আমাকে দিয়ে টাইপ করিয়েছিলেন। সেই চিঠিগুলোতে মারুতি উদ্যোগে ঘটে চলা বেশ কিছু বেনিয়মের কথা তিনি ইন্দিরা গান্ধীর নজরে আনেন। এ কারণে সঞ্জয় গান্ধী সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের উপর ভীষণভাবে চটে যান এবং তাঁর ঘোষিত শত্রুতে পরিণত হন। মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে সরাতে তিনি উঠেপড়ে লাগেন।” পরিবর্তনপন্থীরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁরা সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদলের চেষ্টা শুরু করে দিয়েছিলেন। দিল্লিতে সঞ্জয় গান্ধীও সিদ্ধার্থ শংকরের বিরুদ্ধে ইন্দিরার কানভারী করে যাচ্ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ও পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য তাঁর ঘনিষ্ঠরা তাঁকে নিরস্ত করেন। কারণ তা হলে সঞ্জয় গান্ধীর চাপের কাছে নতিস্বীকার করা হতো। আর জরুরী অবস্থা জারি করে ইন্দিরা গান্ধীও তখন ব্যাপক সমস্যার মধ্যে ছিলেন। সিদ্ধার্থ শংকরকে পদত্যাগ করিয়ে তিনি আর সমস্যা বাড়াতে রাজি ছিলেন না। যাই হোক, ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রে জনতা পার্টি সরকার গঠন করে। ৩০ শে এপ্রিল পশ্চিম বাংলাসহ ৯ টি রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। পরের বিধানসভা নির্বাচনে সিদ্ধার্থ শংকর রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেন নি। কারণ ততদিনে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে গিয়েছিল।
 
কেমন রাজনীতিবিদ ছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায় ? উপরোক্ত আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে ঝানু এবং ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ যাকে বলে সিদ্ধার্থ শংকর একেবারেই তা ছিলেন না। তা হলে প্রদেশ কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এ পর্যায়ে পৌঁছাত না। কিন্তু এটাও ঠিক এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জন্য সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে পুরোপুরি দায়ি করা যায় না। কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কোন নীতিগত কারণে বা মতাদর্শগত কারণে হয় নি। ক্ষমতার লোভ আর ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ ছিল এই দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ। ফলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কংগ্রেসের সংগঠন। কিন্তু সেদিকে কারোর নজর ছিল না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কি এ ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা ছিল? একেবারেই না। তখন কংগ্রেসে হাই কম্যান্ড সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। ইন্দিরা গান্ধীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া সাক্ষীগোপাল মাত্র। ইন্দিরা চাইলে এক ধমকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বন্ধ করে দিতে পারতেন। কিন্তু করেন নি। সম্ভবত সংখ্যালঘু ভোট হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে গনি খানকে চটাতে চান নি। আবার যুগান্তর পত্রিকা গোষ্ঠীর মালিক তরুণকান্তি ঘোষেরও তখন যথেষ্ট ক্ষমতা ও প্রভাব। তাঁকে চটালে কংগ্রেস চালাতে সমস্যা হতো। আসলে এই দ্বন্দ্ব দলের ওপরতলার প্রভাবশালীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এই সুযোগে নীচের তলার নেতারাও করেকম্মে খেয়েছে। স্বার্থে ঘা পড়লে নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে। সংগঠন একেবারে শেষ হয়ে গেছে । ১৯৭২-৭৭ সময়কাল পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে এক বিশৃঙ্খল সময় হিসেবেই পরিচিত থেকে গেছে। ১৯৬৭-৭১ কে যদি নৈরাজ্যের যুগ বলা হয়, তবে ১৯৭২-৭৭ কে অবশ্যই বিশৃঙ্খলার যুগ বলতে হবে। সিদ্ধার্থ শংকর নৈরাজ্যের হাত থেকে বাংলাকে উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারেন নি। এই বিশৃঙ্খলার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বেশ কিছু ভালো কাজ। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সরকার এ রাজ্যে প্রথম ন্যুনতম মজুরী আইন চালু করে। ১৯৭৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইনে ত্রিস্তরবিশিষ্ট পঞ্চায়েত চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কংগ্রেসে আভ্যন্তরীণ গোলমাল এমন পর্যায়ে পোঁছাচ্ছিল যে রক্তারক্তির ভয়ে পঞ্চায়েতের ভোট নেওয়া যায় নি।১৯৭৪ সাল থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক বিপ্লব’ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। পঞ্চায়েত নির্বাচন করা এর পর আর সম্ভব হয় নি। আর এই আইন ব্যবহার করে সি পি এম তথা বামফ্রন্ট পঞ্চায়েত নির্বাচন করলো আর তিন দশক ধরে গ্রাম বাংলাকে হাতের মুঠোয় রেখে দিল। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে কখনোই প্রশ্ন ওঠে নি। এ কারণে মারুতি উদ্যোগ নিয়ে সঞ্জয় গান্ধীর বেআইনী কান্ডকারখানা তিনি ইন্দিরা গান্ধীর গোচরে এনেছিলেন। ইন্দিরার বিষনজরে পড়ার ভয়ে চুপ করে থাকেন নি। ইন্দিরা গান্ধীর সাথেও এরপর তাঁর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে যায়। তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সিদ্ধার্থ শংকর ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস সভাপতি পদে ইন্দিরা গান্ধীর মনোনীত প্রার্থী কে. ব্রহ্মানন্দ রেড্ডির বিরুদ্ধে দলের ইন্দিরা বিরোধী গোষ্ঠীর প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে জিততে পারেন নি। কারণ এ আই সি সি – এর সদস্যদের উপর তখনো ইন্দিরা গান্ধীর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল। তোষামোদ আর চাটুকারিতার সংস্কৃতি ততদিনে দলটাতে জাঁকিয়ে বসেছে। এর কিছুদিন পরে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে ( নভেম্বর ৩০, ১৯৭৭) সিদ্ধার্থ শংকর তাঁর এই পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল তিনি দলে আভ্যন্তরীণ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল ব্রহ্মানন্দ রেড্ডিকে কংগ্রেসকর্মীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি এর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। এই সাক্ষাৎকারেই সঞ্জয় গান্ধী সম্পর্কে তিনি তাঁর বিরক্তি গোপন করেন নি। সঞ্জয় গান্ধী সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল ” I think he is a person who should not be supported “। কিন্ত ভাগ্যের পরিহাস হলো এই রকম একজন সৎ মানুষের মুখ্যমন্ত্রীত্বে দুর্নীতি এবং অসততা যথেষ্ট পরিমাণে ছড়িয়েছিল। পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে এড়িয়ে চাকরি দেওয়ার দায়িত্ব মন্ত্রী, এম এল এ – দের হাতে দিলে দুর্নীতি বাড়বে এটা জেনেও কেন তিনি সেই সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা সত্যিই এক রহস্য। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বিরুদ্ধে বামেদের বিশেষত সি পি এম – এর বড় অভিযোগ তিনি নাকি কাশীপুর – বরানগর অঞ্চলে গনহত্যার নায়ক। তাঁর শাসনকালকে আধা-ফ্যাসিস্ট বলেও তারা বারবার চিহ্নিত করে ( আধা-ফ্যাসিস্ট বস্তুটি কি সেটা ওরাই জানে)। সত্য ঘটনাটা হল কাশীপুর – বরানগর গনহত্যা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১২-১৩ অগাস্ট। সিদ্ধার্থ শংকর রায় তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই হন নি। তিনি তখন কেন্দ্রে শিক্ষামন্ত্রী এবং পশ্চিম বাংলা বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী। ১৯৭৭ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৪ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও সি পি এম তথা বামফ্রন্ট এ ব্যাপারে সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে অভিযুক্ত করতে পারে নি। এই গনহত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ধার করতে পারে নি, বা করে নি। কেবল ভাঙা রেকর্ডের মতো কাশীপুর – বরানগর গনহত্যার গান বাজিয়ে গেছে। সি পি এম – এর অন্তত সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে আধা-ফ্যাসিস্ট বলা উচিৎ নয়। ১৯৭৫ থেকে ৭৭ জরুরী অবস্থার সময় একজন সি পি এম-এর নেতা কর্মীও গ্রেপ্তার হন নি। কেবল জ্যোতির্ময় বসু গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাও বাংলায় নয়, দিল্লিতে। জরুরী অবস্থায় মূলত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আর এস এস ও জনসংঘের কর্মীদের এবং সমাজবাদী দলগুলোর নেতা কর্মীদের। অবশ্যই জরুরী অবস্থা জারি, রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার আর সংবাদমাধ্যমের কন্ঠরোধকে কোন যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা যায় না।
 
কিন্তু সমালোচনার প্রাবল্যে আমরা ভুলে যাই সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের একটা অদ্ভুত গুণ ছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তিনি কখনো শত্রু মনে করেন নি। তাই সর্বহারার মহান নেতার পুত্রকে শ্রীনগর মেডিকেল কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন ফারুক আবদুল্লাকে অনুরোধ করে। রাজনীতি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কখনোই তিনি মিশিয়ে ফেলেন নি। ১৯৮৬ -৮৯ সময়কালে সহিংস খালিস্তানি আন্দোলনের ঠিক পরে রাজীব গান্ধীর অনুরোধে পাঞ্জাবের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভয়ে পিছিয়ে আসেন নি। ১৯৯২-৯৬ সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও -এর অনুরোধে। ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক উন্নত করার গুরুদায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ এবং পরে বিল ও হিলারি ক্লিনটনের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি দুদেশের সম্পর্ককে অনেকটাই স্বাভাবিক করতে পেরেছিলেন। ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও-এর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর সফল করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের উদ্যোগে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি উইলিয়াম রেনকুইস্ট-এর নেতৃত্বে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সমস্ত বিচারপতি ভারত সফর করেন। বিশ্বের দুটি বৃহৎ গনতন্ত্রের সাংবিধানিক ব্যাবস্থার রক্ষকদের তিনি একসাথে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।
 
সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে সফল রাজনীতিবিদ বলা যাবে না। ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ হলে হয়তো বাংলার ইতিহাসে তাঁর নাম অন্যভাবে লেখা হতো। কিন্তু তিনি তাঁর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হন নি। সিদ্ধার্থ শংকর রায় বোধহয় ভুল দলে ঠিক ব্যক্তি ছিলেন। ফলে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়াই ছিল তাঁর ভবিতব্য। আজ যখন রাজনীতিবিদদের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সেখানে সিদ্ধার্থ শংকর রায় একজন অনুকরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হতেই পারেন। জন্মশতবর্ষে তাঁর রাজনীতি ও ভূমিকার নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহ মুল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন।
 
★ আমি সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের গুণমুগ্ধ নই। তাঁর রাজনীতির সমর্থকও নই। কিন্তু আমি মনে করি ব্যক্তির ভূমিকার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। সিদ্ধার্থ শংকর রায় সম্পর্কে এই নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভীষণ অভাব। শুধু সিদ্ধার্থ শংকর রায়ই নন, বিধান চন্দ্র রায়কে বাদ দিলে বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীদের স্মৃতিতে তেমন কিছুই করা হয় নি। যেমন মেদিনীপুর জেলায় ৯০-এর দশকে একের পর এক কলেজের নাম সুকুমার সেনগুপ্ত (সি পি এম-এর প্রাক্তন জেলা সম্পাদক) কিংবা অনিল বিশ্বাসের নামে রাখা হয়েছিল। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রতিষ্ঠাতা সতীশ সামন্ত কিংবা সুশীল ধাড়ার নাম কিংবা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জির নাম কারোর মনে পড়ে নি। বেশ কয়েক বছর আগে এখনকার শাসক দলের শিক্ষাজগতের এক মাতব্বরের কাছে এই রকম একটা প্রস্তাব রেখেছিলাম। উপরোক্ত নামগুলোর সাথে আরামবাগে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রফুল্ল সেন – এর নামে, দক্ষিণ কলকাতার একটি আইন কলেজের নাম সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের নামে করার অনুরোধ করেছিলাম। এর দ্বারা হয়তো এঁদের অবদানকে কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দেওয়া হতো। পরে বুঝেছি এদের এসব না বলাই ভালো। এদের মাথায় এসব ঢুকবে না। অন্য রাজ্যে দলমত বিচার না করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমরা রাজনীতির উপরে উঠতে পারলাম না।
 
★★ ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন ।